Nabanna On DA: নির্ধারিত সময়ে ডিএ দেওয়া সম্ভব নয়, সুপ্রিম কোর্টে সময় চাইল রাজ্য
বাংলার সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ (Dearness Allowance) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলছে। এই বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বড় আপডেট সামনে এসেছে। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডিএ মেটানো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সেই কারণে সুপ্রিম কোর্টে নতুন করে আবেদন করে আরও সময় চেয়েছে রাজ্য সরকার।
ফেব্রুয়ারি মাসের ৬ তারিখ সুপ্রিম কোর্ট এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেয়। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, রাজ্য সরকারকে প্রথমে ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ এরিয়ারসহ দিতে হবে এবং বাকি ৭৫ শতাংশ ডিএ ৩১ মার্চের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে। কিন্তু রাজ্য সরকার এখন জানিয়েছে, এত কম সময়ের মধ্যে এই কাজ করা সম্ভব নয়। তাই তারা আদালতের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও সরকারি কর্মীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক কর্মীই ভাবছেন, এবার আদৌ ডিএ পাওয়া যাবে কি না।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ
ডিএ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল স্পষ্ট। আদালত জানিয়েছিল—
• প্রথমে ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ দিতে হবে।
• এই টাকা দিতে হবে এরিয়ারসহ।
• এরপর বাকি ৭৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ ৩১ মার্চের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে।
এই নির্দেশের পর সরকারি কর্মী সংগঠনগুলো কিছুটা আশাবাদী হয়েছিল। কিন্তু এখন রাজ্য সরকারের নতুন আবেদনের ফলে সেই আশা আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
রাজ্যের নতুন আবেদন
রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে সমস্ত হিসাব করে ডিএ দেওয়া সম্ভব নয়। তাই তারা আদালতের কাছে আরও সময় চেয়েছে।
রাজ্যের আবেদন অনুযায়ী—
• ২৫ শতাংশ ডিএ এখনই দেওয়া সম্ভব নয়
• পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগবে
• আগামী ৩১ ডিসেম্বরের আগে ডিএ দেওয়া সম্ভব নয়
এই কারণেই রাজ্য সরকার আদালতের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে।
সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীর সংখ্যা
রাজ্য সরকার তাদের আবেদনে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে সরকারি কর্মী এবং পেনশনভোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতে সময় লাগছে।
রাজ্যের দাবি অনুযায়ী—
• রাজ্যে লক্ষ লক্ষ কর্মরত সরকারি কর্মচারী রয়েছেন
• পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী বা পেনশনভোগী আছেন
• প্রত্যেকের হিসাব আলাদা করে যাচাই করতে হচ্ছে
এই কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে রাজ্য আদালতে জানিয়েছে।
পেনশনভোগীদের তথ্য নিয়ে সমস্যা
রাজ্যের আবেদনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের সম্পূর্ণ তথ্য রাজ্য সরকারের কাছে নেই।
রাজ্যের বক্তব্য অনুযায়ী—
• অনেক পেনশনভোগীর তথ্য C&AG (Comptroller and Auditor General) দফতরে সংরক্ষিত আছে
• সেই তথ্য সংগ্রহ করতে সময় লাগছে
• তথ্য যাচাই না করে ডিএ হিসাব করা সম্ভব নয়
এই কারণেও পুরো প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বলে রাজ্য দাবি করেছে।
হিসাব নিকাশের জটিলতা
ডিএ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে। কারণ ডিএ নির্ধারণ করা হয় AICPI (All India Consumer Price Index) অনুযায়ী।
এই সূচকের ভিত্তিতে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত—দুই ধরনের কর্মীদের জন্যই ডিএ নির্ধারণ করতে হয়।
কিন্তু এখানে একটি বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা রয়েছে।
রাজ্যের বক্তব্য অনুযায়ী—
• ডিজিটাল পদ্ধতিতে বেতনের তথ্য ২০১৬ সাল থেকে পাওয়া যাচ্ছে
• তার আগের সমস্ত তথ্য হাতে লেখা সার্ভিস বুক-এ রয়েছে
• সেই সার্ভিস বুক খুঁজে বের করে যাচাই করতে হচ্ছে
এই কাজ করতে অনেক সময় লাগছে বলে রাজ্য জানিয়েছে।
সার্ভিস বুক খুঁজে বের করার সমস্যা
২০১৬ সালের আগে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের তথ্য যাচাই করতে বড় সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে প্রশাসন।
কারণ—
• পুরনো কর্মীদের তথ্য ডিজিটাল আকারে নেই
• সেই তথ্য খুঁজতে হচ্ছে হাতে লেখা সার্ভিস বুক থেকে
• প্রতিটি কর্মীর সার্ভিস বুক আলাদা করে পরীক্ষা করতে হচ্ছে
এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ বলে রাজ্য আদালতে উল্লেখ করেছে।
বকেয়া ডিএ মেটানোর আর্থিক চাপ
ডিএ মেটানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিষয় হল রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি। রাজ্যের দাবি অনুযায়ী, একসঙ্গে এত বড় অঙ্কের টাকা মেটানো সহজ নয়।
রাজ্যের আবেদনে বলা হয়েছে—
• ডিএ মেটাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন
• সেই টাকা রাজ্যের বাজেটে বরাদ্দ করা সম্ভব কি না, সেটাও বিবেচনা করতে হবে
• আর্থিক পরিকল্পনা ছাড়া এই টাকা দেওয়া সম্ভব নয়
এই কারণেও সময় প্রয়োজন বলে রাজ্য জানিয়েছে।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ
রাজ্যের আবেদনে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সামনে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে।
রাজ্যের বক্তব্য—
• নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক কাজের চাপ বেড়ে যায়
• নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কারণে অনেক দফতর ব্যস্ত থাকে
• এই পরিস্থিতিতে ডিএ হিসাবের কাজ দ্রুত করা কঠিন
এই কারণেও রাজ্য আদালতের কাছে সময় চেয়েছে।
কর্মচারী সংগঠনের আন্দোলন
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও সরকারি কর্মীদের একটি বড় অংশ সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে, রাজ্য সরকার আদৌ ডিএ দেবে কি না।
এই কারণে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ নামে কর্মচারী সংগঠন আন্দোলন শুরু করে।
তারা সিদ্ধান্ত নেয়—
• নবান্নে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হবে
• দ্রুত ডিএ মেটানোর দাবি জানানো হবে
কিন্তু সেই স্মারকলিপি নবান্নে সরাসরি জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্মারকলিপি জমা দেওয়ার ঘটনা
কর্মচারী সংগঠনের সদস্যরা নবান্নে গিয়ে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা তা জমা দিতে পারেননি।
পরে কী হয়?
• পুলিশের মাধ্যমে সেই স্মারকলিপি নবান্নে পাঠানো হয়
• সেখানে কর্মীদের দাবি জানানো হয়
• দ্রুত ডিএ মেটানোর দাবি তোলা হয়
এর মধ্যেই আবার রাজ্যের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে নতুন আবেদন করা হয়েছে।
এখন কী হতে পারে?
এখন সবকিছু নির্ভর করছে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
আদালত তিনটি সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে—
1. রাজ্যের আবেদন গ্রহণ করে সময় বাড়াতে পারে
2. নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ডিএ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে
3. নতুন করে শুনানির দিন নির্ধারণ করতে পারে
এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে সরকারি কর্মীরা কবে বকেয়া ডিএ পাবেন।
